বাফা প্রতিষ্ঠার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
বাফা'র ৬ যুগ
বুলবুল ললিতকলা একাডেমির প্রতিষ্ঠা BulBul Academy of Fine Arts (BAFA)
সম্পাদনা ও সংক্ষেপন- মো: ফজলুর রহমান, সম্পাদক-বাফা
মাহমুদ নূরুল হুদা
প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক
১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর পূর্ব বাংলার সংস্কৃতি চর্চায় প্রবল বাধা বিঘ্ন দেখা দেয়। প্রথমত, বিভাগপূর্ব বাংলার রাজধানী কলকাতা থাকায় বিভাগপূর্বকালে বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্রবিন্দু ছিলো কলকাতা। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে সংস্কৃতিচর্চার যে অবকাঠামো তৈরি হয়েছিলো, দেশ বিভাগের পর ঢাকা-কেন্দ্রিক বাঙালি মুসলমান তার থেকে বঞ্চিত হয়। দ্বিতীয়ত, নবগঠিত পাকিস্তানের প্রবক্তাগণের যে রাজনীতিক দর্শন ছিলো, তা কোনো একটা আদর্শ রাষ্ট্রের জন্য পূর্ণাঙ্গ ছিলো না। দ্বিজাতিতত্ত্ব নিয়ে যাঁরা মাথা ঘামিয়েছিলেন, নবগঠিত রাষ্ট্রে সে তত্ত্বের অসারতা প্রমাণিত হলেও সে তত্ত্বের অনুসারীগণ বহু দিন পর্যন্ত তার উপর দাঁড়িয়ে অন্ধ আস্ফালন করে যাচ্ছিলেন। অনেকের মনে এমন ধারণা বদ্ধমূল হচ্ছিলো যে, নবগঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানের জাতীয় সংস্কৃতির একমাত্র উপাদান ইসলাম ।
এ রকম পরিস্থিতিতে হাজার বছর ধরে বাংলার হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় লালিত ও বিকশিত শাশ্বত বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা ব্যাহত হবে, সেটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও মনিষীগণ স্পষ্টতই উপলব্ধি করেছেন যে, একটি জাতিকে পরিপূর্ণরূপে বিকশিত ও সঠিক পথে চালিত করতে হলে জাতীয় সংস্কৃতির সুষ্ঠু চর্চা ও বিকাশ অপরিহার্য। ধর্ম পরিচয়ে মুসলমান হলেও আধুনিক পৃথিবীর বহু জাতির আলাদা আলাদা সংস্কৃতি রয়েছে বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক পরিচয়ও সেই অনুসারে স্বতন্ত্র। এ সময়ের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের মতো বুলবুল চৌধুরীও এ কথায় বিশ্বাসী ছিলেন। ১৯৫০ সালে পশ্চিম পাকিস্তান সফরকালে করাচির হোটেল মেট্রোপলে বুলবুল চৌধুরীকে যে সম্বর্ধনা দেওয়া হয়, তার জবাবে তিনি একথা স্পষ্টভাবে বলেছিলেন। নবগঠিত পাকিস্তানের জাতীয় সংস্কৃতি প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি খুব জোরের সঙ্গেই বলেছিলেন যে, পাকিস্তানের জাতীয় সংস্কৃতি হবে বাঙালি, পাঞ্জাবি, বেলুচ, পাঠান প্রভৃতি জাতির নিজ নিজ সংস্কৃতিক উপাদানের সুস্থ বিকাশের মধ্য দিয়ে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, জাতীয় সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান ইসলাম হলেও তা মূল বা একমাত্র উপাদান নয়। সেদিন তিনি আরো একটি বিষয়ে ভবিষ্যৎ বাণী করে বলেছিলেন এভাবে যে, জাতীয় সংস্কৃতির নামে যদি বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতির গতিধারার প্রতি অবিচার করার চেষ্টা চালানো হয়, তাহলে রাষ্ট্রের সংহতি বিপন্ন হতে পারে। বুলবুলের এ ভবিষ্যৎবাণী পরবর্তীকালে ফলেছিলো।
বস্তুত বুলবুল চৌধুরী চেয়েছিলেন শিকড়ভিত্তিক সংস্কৃতির চর্চা ও তার সুস্থ বিকাশ। এ প্রক্রিয়ার মধ্যেও সৌন্দর্যপ্রীতি ও মানুষের প্রতি যে ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে, তা মানুষের গোষ্ঠীগত গণ্ডীকে অতিক্রম করায় বিরোধ ও সংঘর্ষের সেখানে কোনো অবকাশ নেই।
সংস্কৃতি চর্চার এমন মূল তত্ত্ব নিয়ে বুলবুলের সঙ্গে আমার বহু আলাপ-আলোচনা হয়েছে। বুলবুলের চিন্তা-চেতনার কেন্দ্রবিন্দু ছিলো নৃত্য । বাঙালি মুসলমান সমাজের রক্ষণশীল মানস-প্রবণতাকে সে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলা। এ বোধের ফলে তার সৃষ্ট নৃত্যে যে সাংস্কৃতিক সমন্বয় ঘটে, তা যেমন ছিলো উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক অভিনব বিষয়, তেমনি বাঙালি মুসলমানের বহুকাল সুপ্ত মনোজগতের এক ছন্দময় বহিঃপ্রকাশ ।
বুলবুল আমাকে প্রায়ই বলতো আমাদের এ ললিতকলার চর্চাকে ধরে রাখতে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ। আমিও তা ভালোভাবে উপলব্ধি করতাম। কেননা, আমি জানতাম বাংলার সাধারণ মুসলমান পরিবারের সামাজিক পরিবেশ সাধারণত ললিতকলা চর্চার জন্য যথেষ্ট উপযোগী নয়। বুলবুল প্রতিভার বিকাশ সেখানে সম্পূর্ণ এক ব্যতিক্রমী ঘটনা ছিলো। ব্যাপারটি উপলব্ধি করে কলকাতায় ছাত্র থাকাকালেই আমরা একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের জন্ম দিয়েছিলাম । বুলবুল এবং আমি স্বপ্ন দেখতাম কিভাবে পূর্ববাংলার কেন্দ্রবিন্দু ঢাকাতেই একটি আধুনিক সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্র গড়ে তোলা যায় । তবে বুলবুলের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আমাদের সে স্বপ্ন সফল হয়নি।
বুলবুল ললিতকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার সময়কার কথা মনে করতে গিয়ে প্রথমেই মনে পড়ছে অন্তিম রোগে আক্রান্ত বুলবুলের শেষ কথাগুলো। কলকাতায় চিকিৎসার জন্য শেষবারের মতো যখন তাঁকে তেজগাঁ বিমান বন্দরে তুলে দিতে যাচ্ছিলাম, তখন ১৯৫৪ সালের এপ্রিল মাস। গাড়িতে বসে সে আমার হাত চেপে ধরে কান্নাভারাক্রান্ত গলায় এবং বিষণ্ণ
দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেছিলো, “আমার অ্যাকাডেমি হবে না?” সেদিন তাঁকে আমি সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলাম, 'অ্যাকাডেমি হবে, তোর নামেই অ্যাকাডেমি হবে'। কলকাতায় ১৭ই মে ১৯৫৪ তে বুলবুল মারা যাবার পর থেকে বুলবুল ললিতকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত প্রায় সব সময়ে বুলবুলর সেই অন্তিম ইচ্ছা আর আমার অঙ্গীকার আমাকে প্রতিনিয়ত তাড়িত করে নিয়ে বেড়িয়েছে, আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে, উৎসাহিত করেছে, দিনরাত পরিশ্রম করে প্রায় এক বছরের মধ্যেই একটি প্রতিষ্ঠাকে স্বপ্ন থেকে বাস্তবে রূপায়িত করার অনুপ্রেরণা দান করেছে। তবে এ কাজে আমি সে সময়ের ঢাকার বহু বুদ্ধিজীবী ও বুলবুল অনুরাগীদের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতা পেয়েছিলাম, যা না হলে এ জাতীয় অসাধ্য সাধন আমার পক্ষে সম্ভব হত না
১৯৫৪ সালের ১৭ মে বুলবুলের মৃত্যু হয়েছিলো কলকাতার চিত্তরঞ্জন ক্যানসার হাসপাতালে। তাঁর মৃত্যুর ঠিক এক বছর পর ১৯৫৫ সালের ১৭ মে তারিখেই ওয়াইজঘাট এলাকায় তারই নামে আমরা বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর শুভ উদ্বোধন করতে সক্ষম হয়েছিলাম। মাত্র এক বছরের মধ্যে এ জাতীয় সফলতার পেছনে আমাদের যেসব উদ্যোগ ও কর্মসূচি বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলো, সে সম্পর্কে দু-চার কথা বলা যায় ।
শোকসভা
বুলবুলের মৃত্যুর পর ঢাকার বুদ্ধিজীবী মহলে বিশেষভাবে সংস্কৃতিসেবী ও সংস্কৃতিপ্রেমিকদের এক ব্যাপক শোকের ছায়া নেমে আসে। ১৭ তারিখ মারা গেলেও আমি তাঁর মৃত্যুর খবর পাই ১৮ই মে সকালবেলা রেডিও মারফত। খবর শোনার পর আমাদের মৌলবী বাজারের বাড়িতে আমার মা ও ভাইবোনেরা সবাই কান্নায় ভেঙে পড়ে। আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুর মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে এই অকাল মৃত্যু আমাকে কতোটা শোকাভিভূত করেছিলো তা সহজেই অনুমেয়। কিছু ধকল সামলানোর পর একটা রিকশা নিয়ে সকাল ১০টার দিকে প্রথমেই বেগম আনোয়ারা চৌধুরীর (মিসেস বাহার) সঙ্গে দেখা করি এবং বুলবুলের মৃত্যুর খবর দিই। মিসেস বাহার তখন বাংলাবাজার গার্লস হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। স্কুলের গেটেই তাঁকে পেয়ে যাই । খবরটা শোনামাত্রই তিনি হু-হু করে কেঁদে ওঠেন। বুলবুলকে নিয়ে শিগগিরই একটা শোকসভা করা যায় কিনা, তা নিয়ে আলোচনার জন্য বিকেল-বেলা কোথাও বসবো বলে তাকে জানিয়ে আমি সেক্রেটারিয়েটে যাই । সেখানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আবুল মনসুর আহমদের সঙ্গে দেখা করে বললাম, 'মনসুরদা, বুলবুল তো চলে গেলো।” মনসুর সাহেবের চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো। এ সময়ে আমি বুলবুলের শেষ ইচ্ছা তথা একটি ললিতকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার স্বপ্নের কথা তাঁকে জানালাম। শোকসভার প্রসঙ্গও উঠলো। শোকসভা ও একাডেমী প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আমার পরিকল্পনার সঙ্গে মনসুর সাহেব একমত হন এবং বলেন, আমি তোমাকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তুমি এগিয়ে যাও বুলবুলের শোকসভা ও অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আমার উৎসাহ দেখে মনসুর সাহেব খুব আশ্বস্ত হয়েছিলেন এবং ঐ দিন বিকেলেই আমরা এ বিষয়ে বৈঠক করছি শুনে তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন এবং শোকসভার দিন অবশ্যই হাজির থাকবেন বলে কথা দিয়েছিলেন।
ঐদিন বিকেলের বৈঠকে বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ, মিসেস আনোয়ারা বাহার চৌধুরী, মোহাম্মদ মোদাব্বের প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। কোনো রকম দেরি না করেই বুলবুলের মৃত্যুতে জাতীয় শোক-সভা করার আহ্বান জানিয়ে বিভিন্ন দৈনিক কাগজে প্রকাশের জন্য একটি বিবৃতি প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় । এ বিবৃতিতে আমি ছাড়া আর যাঁরা সই করেছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন বেগম শামসুন নাহার মাহমুদ, আবুল মনসুর আহমেদ, মোহাম্মদ মোদাব্বের, অধ্যাপক অজিত কুমার গুহ, সৈয়দ আজিজুল হক নান্না মিয়া প্রমুখ।
অবশেষে ১৯৫৪ সালের ২৮শে মে ঢাকার কার্জন হলে মৃত্যুর মাত্র ১১দিন পর জাতীয় শোক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যা বেলায় অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিলো। ঢাকা শহরের বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী ও শিল্পানুরাগী ব্যক্তিগণ এ সভায় উপস্থিত ছিলেন। তদানীন্তন পূর্বপাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী আবুল মনসুর আহমেদ এ শোকসভায় সভাপতিত্ব করেন। সভায় গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন সর্বজনাব শামসুন নাহার মাহমুদ, আব্বাসউদ্দীন আহমেদ, কামরুল হাসান, অধ্যাপক অজিত কুমার গুহ, মোহাম্মদ মোদাব্বের প্রমুখ সুধীজন । আমি আমার বক্তব্যে বুলবুলের অন্তিম আকাঙ্ক্ষা এবং আমার ওয়াদার কথা বলে সকলের কাছে বুলবুল ললিতকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠায় সহায়তার আবেদন জানাই । সভাপতির ভাষণে জনাব আবুল মনসুর আহমেদ আমার পরিকল্পনার ওপর বিশেষ জোর দেন এবং আমাকে সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন এবং অন্যদেরকেও এগিয়ে আসতে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বুলবুলের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে একটি ললিতকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।
বুলবুল একাডেমী প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহ ও প্রচারের কর্মসূচি চালিয়ে যেতে আমি একটি শক্তিশালী কমিটি গঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করি। বিশেষভাবে তহবিল গঠনের জন্য যে একটি বুলবুল স্মৃতি সম্মেলন করা আবশ্যক সে ব্যাপারে অনেকের সঙ্গে আলাপ করে স্থির নিশ্চিত হই। বুলবুলের এ শোকসভার পূর্বেই আমি উক্ত সম্মেলন করার জন্য একটি খসড়া প্রস্তুতি কমিটিও তৈরি করি। শোক-সভার এক পর্যায়ে আমি আমার সে প্রস্তাব ও খসড়া কমিটি উপস্থাপন করেছিলাম। মূল খসড়ায় ৬০ জনের নাম ছিলো, সভা থেকে আরো ৪০ জনের নাম তার সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
কমিটিটি ছিলো নিম্নরূপঃ
পৃষ্ঠপোষক: এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, এইচ এস সোহরাওয়ার্দী।
কনভেনর: মাহমুদ নূরুল হুদা।
সদস্যবৃন্দঃ আবুল মনসুর আহমেদ, সৈয়দ আজিজুল হক নান্না মিয়া, বেগম শামসুন নাহার মাহমুদ, বেগম আনোয়ারা চৌধুরী, মোহাম্মদ মোদাব্বের, অধ্যাপক অজিত কুমার গুহ, কামরুল হাসান, শামসুল হুদা চৌধুরী, লায়লা আর্জুমান্দ বানু, আবদুস সালাম, সৈয়দ নূরুদ্দীন, আবেদ জুবেরী, আর্টস কলেজের প্রিন্সিপাল জয়নুল আবেদীন, এম এ রশীদ, এক্তি হাজারী, ড. কিউ এম হোসেন, বেগম হোসনেয়ারা, লায়লা সামাদ, মোতাহার হোসেন সিদ্দিকী, তোফাজ্জল হোসেন, সৈয়দ ইউসুফ আমি হাসান, প্রবোধ গুহ, কবি জসীমউদ্দীন, আববাসউদ্দীন আহমেদ, হবীবুল্লাহ বাহার, নমিতা আনোয়ার, এম আর খান, এফ আর খোন্দকার, শান্তি নন্দী, রফিকুল ইসলাম, আনিসুজ্জামান, আহমেদ হোসেন, বদরুল হাসান, মমতাজ বেগম, হাবিবুল হক, আমিনা মাহমুদ, সেলিনা মাহমুদ, মিসেস বি আহমেদ, বেগম সুফিয়া কামাল, ড. এম হক, এম রহমান, ড. সাদেক, হাসান হাফিজুর রহমান, খালেদা ফ্যান্সি খানম, খাদেম হোসেন খান, গওহর জামিল, তোফাজ্জল হোসেন . মুকুল, শেখ লুৎফুর রহমান, আবদুল লতিফ, সরফুল আলম, মইনুদ্দীন, আসাদুজ্জামান, ডা. ইব্রাহীম, এম সফীউল্লাহ, বেগম তাজউদ্দীন, মজহারুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, কামাল উদ্দীন, অধ্যাপক ওবায়দুর রহমান, নূরজাহান বেগম, আবদুল কাদির, অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই, মাহবুব আনাম, ডা. ডাব্লিউ মাহমুদ, আবদুল মতিন ইউ পি পি, এস এম তৈফুর, কামাল মাহমুদ, তরীকুল আলম, এ বি এম মুসা, মহীউদ্দীন আহমেদ, সেলিনা বাহার, মোঃ মহসিন, আবিদ হোসেন, লুৎফুন্নেসা চৌধুরী, জহুর হোসেন চৌধুরী, সৈয়দ জাফর আলী, ফয়েজ আহমেদ, হিমাংশু দত্ত, এম এ গণি এ পি পি, এম এ নান্না, তছিকুল আলম খান, ইজাবুদ্দীন আহমেদ, আহমেদ জামাল, এ মতিন, আবদুল ওয়াহাব, ডা. আবদুল্লাহ, মিসেস বদরুন্নেসা আবদুল্লাহ, অধ্যাপক আহমদ শরীফ, অধ্যাপক জে গুহঠাকুরতা, মিসেস বাসন্তী গুহঠাকুরতা, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, মিজানুর রহমান, এস এন বাকের, বেগম সনোয়ার আলী ।
প্রস্তুতি কমিটি বেশ কয়েকটি উপকমিটি গঠন করে। এগুলো ছিলো: ললিতকলা প্রদর্শনী উপকমিটি, অভ্যর্থনা উপকমিটি, প্রচার উপকমিটি, এবং সমন্বয় উপকমিটি। বেগম আনোয়ারা বাহার চৌধুরী ও মোহাম্মদ মোদাব্বের যথাক্রমে প্রস্তুতি উপকমিটির কোষাধ্যক্ষ ও প্রচার সম্পাদক নিযুক্ত হন।
২৮ মে বুলবুলের শোকসভা অনুষ্ঠানের মাত্র দুই দিন পরে পূর্বপাকিস্তানের যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভার বিরুদ্ধে “কমিউনিস্ট বিশৃঙ্খলা দমনে” অপারগতার অভিযোগ এনে কেন্দ্রীয় সরকার ৯২-ক ধারা অনুসারে কেন্দ্রীয় শাসন জারি করে । মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলাকে তখন তাঁর নিজস্ব টিকাটুলীর কে এম দাস লেনের বাড়িতে অন্তরীণ করা হয় এবং মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জাকে গভর্নররূপে নিয়োগ করা হয় । কেন্দ্রীয় শাসন জারি হবার ফলে এবং যুক্তফ্রন্ট কর্মীদেরকে ব্যাপকভাবে ধরপাকড় করার ফলে বুলবুলের শোকসভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসারে আমরা আমাদের কাজকর্ম ভালোভাবে চালিয়ে যেতে পারছিলাম না। এজন্য বুলবুল স্মৃতিসম্মেলনের প্রস্তুতি কমিটির সদস্যগণও পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুসারে খুব একটা অগ্রসর হতে পারেনি। তা সত্ত্বেও ধীর গতিতে হলেও আমি আমার সহকর্মীদেরকে নিয়ে বিভিন্ন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, বুদ্ধিজীবী ও ব্যবসায়ী মহলে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছিলাম ।
ইতিমধ্যে খবর পেলাম কলকাতাস্থ বুলবুলের নৃত্যের দলটি ভেঙে গেছে । বুলবুলের স্ত্রী আফরোজা কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে চলে এসেছেন এবং পাকিস্তানের শুল্ক বিভাগের চট্টগ্রামস্থ অফিসে চাকরি নিয়েছেন। বুলবুল স্মৃতিসম্মেলনের প্রস্তুতি কমিটি চট্টগ্রামে - আফরোজা বুলবুলের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং কমিটির তৎপরতা ও পরিকল্পনা সম্পর্কে জানায়। বুলবুলের অন্তিম ইচ্ছা অনুসারে একটি ললিতকলা অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠাই যে এ জাতীয় সম্মেলনের মূল লক্ষ্য সে সম্পর্কেও তাঁকে অবহিত করা হয়। এ জাতীয় উদ্যোগে আফরোজা বুলবুলের সক্রিয় অংশগ্রহণকে আমরা খুবই আবশ্যক বিবেচনা করেছিলাম এবং সে অনুযায়ী আমরা তাঁকে এ সম্মেলন সফল করার প্রক্রিয়ায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার জন্য আহ্বান জানাই । তিনিও সানন্দে রাজি হন । এক পর্যায়ে তিনি শুল্ক বিভাগের চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে ঢাকায় চলে আসেন এবং আমাদের সঙ্গে সম্মেলন সফল করার কাজে সার্বক্ষণিকভাবে আত্মনিয়োগ করেন।
আফরোজা বুলবুল ঢাকা এসে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির কাজে আমাদের সঙ্গে আন্তরিকভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এক সময়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে, আফরোজা বুলবুলকে দিয়ে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করা হলে তা বুলবুল স্মৃতি সম্মেলনের জন্য যথেষ্ট ফলপ্রদ হবে । সে অনুসারে তখনকার ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনের কাছে বর্তমান ওসমানী উদ্যানের বিপরীত দিকে বর্তমানে লুপ্ত রমনা রেস্ট হাউসে আমরা একটা সাংবাদিক সম্মেলনের ব্যবস্থা করি। এ ব্যাপারে সম্মেলনের আগের দিন ওল্ড সার্কিট হাউসে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কামরায় আমি, আফরোজা ও ওয়ালীউল্লাহ তিনজনে মিলে বহুক্ষণ ধরে আলাপ-আলোচনা করি । আমাদের আলোচনার উপর ভিত্তি করে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ইংরেজিতে একটা বক্তৃতা তৈরি করে। দেয়, যে বক্তৃতা আফরোজা পরের দিনের সাংবাদিক সম্মেলনে পাঠ করেছিলেন। তবে বক্তৃতার পর সাংবাদিকদের প্রদত্ত প্রশ্নের জবাব আফরোজা উপস্থিতমতো দিয়েছিলেন। আফরোজাকে দিয়ে করানো এ সাংবাদিক সম্মেলন বেশ ফলপ্রসূ হয় । আফরোজা বুলবুল সেদিনকার সাংবাদিক সম্মেলনে যে বক্তব্য রেখেছিলেন, তার সারমর্ম নিম্নরূপ: “বুলবুল চেয়েছিলেন দেশের মেধাবী শিল্পীরা একত্র হয়ে ললিতকলা বিষয়ে গভীর চিন্তাভাবনায় মনোনিবেশ করে নতুন শিল্পের জন্ম দিক। তাঁর ধারণা ছিলো, একটি অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠা ছাড়া এ জাতীয় স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করা সম্ভব নয়। মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার ইচ্ছা ছিলো একটি অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠিত হোক। তাঁর সে ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে গেছে। অনুরূপ একটি অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আমি আমার সর্বশক্তি নিয়োগ করতে চাই। এ ব্যাপারে দেশবাসীর সাহায্য সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।” বুলবুল স্মৃতিদিবস
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি ১৯৫৫ সালের পয়লা জানুয়ারি বুলবুল স্মৃতি দিবস পালন করে। পয়লা জানুয়ারি ছিলো বুলবুলের জন্মদিন। এ দিনটিতে বিশেষ কর্মসূচি পালনের জন্য দেশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ পূর্বেই একটি যুক্তবিবৃতি প্রদান করেছিলেন। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন বেগম শামসুন নাহার মাহমুদ, পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের প্রেসিডেন্ট, পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক, অগ্রণী শিল্পী সংস্থার সাহিত্য সম্পাদক, ঢাকা আর্ট গ্রুপের সেক্রেটারি, পূর্ব পাকিস্তান আর্টিস্ট গ্রুপের সম্পাদক, All Pakistan Women's Association-এর সাধারণ সম্পাদিকা, পূর্ব বাংলার লেখক সংস্থার সভাপতি, এবং তমদ্দুন মজলিসের প্রতিনিধিবৃন্দ। বিবৃতি দানকারী ব্যক্তিগণ বুলবুল স্মৃতি দিবসের দিন বিকাল সাড়ে পাঁচটায় জেলা বোর্ড মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত আলোচনাসভায় অংশগ্রহণ করে বুলবুলের জীবন ও কর্মের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা করেছিলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীত-সাধক ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ঢাকায় অবস্থানের সুযোগ গ্রহণ করে আমরা তাঁকে বুলবুল স্মৃতি দিবসের সভাপতি করতে সক্ষম হই এবং এই সুবাদে প্রস্তাবিত বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর প্রসপেকটাস ও সিলেবাস তৈরি বিষয়ে আমরা তাঁর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করি। প্রসপেকটাস ও সিলেবাসের খসড়া তৈরি করার পর ওস্তাদ মুনশী রইসউদ্দীন ও মাহমুদ হোসেন খসরুকে আমরা আলাউদ্দিন খাঁর কাছে দেখানোর জন্য পাঠিয়েছিলাম, তখন তিনি কুমিল্লায় ছিলেন।
১লা জানুয়ারির বুলবুল স্মৃতি দিবসের এ সভায় সভাপতির ভাষণে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ যা বলেছিলেন, তার সারমর্ম এরকম; “বুলবুলকে আমি জানতাম। এই উচ্চশিক্ষিত মেধাবী শিল্পীর অকালমৃত্যুতে আমি মর্মাহত। বুলবুলকে দেশকে দেওয়ার অনেক কিছু ছিলো। বুলবুল স্মৃতি কমিটির তার নামে অ্যাকাডেমির প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত সঠিক হয়েছে। প্রস্তাবিত এ অ্যাকাডেমির প্রতি আমার সব রকম সাহায্যের আন্তরিক প্রতিশ্রুতি রইলো ।”
১লা জানুয়ারির এ সভায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মধ্যে ছিলো বুলবুল স্মৃতি তহবিল গঠনের ঘোষণা এবং চাঁদা আদায়ের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান। এ ছাড়া এ সভাতে ১লা থেকে ৫ই ফেব্রুয়ারি ১৯৫৫ তে বুলবুল স্মৃতি সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা দেওয়া হয়েছিলো।
কিছুটা অপ্রাসিঙ্গক হলেও ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গে এ সময়ে আমার যে কথাবার্তা হয়েছিলো, সে সম্পর্কে দু একটা প্রসঙ্গের স্মৃতিচারণ করে নিতে চাই। তাঁর কথা বলার ভঙ্গি ছিলো খুবই সহজ সরল, যাকে সহজেই বলা যেতে পাৱে শিশুসুলভ। ঢাকায় তাঁকে পাজামা, লম্বা কোট, গলায় চাদর ও মাথায় টুপি পরে থাকতে দেখেছি। মনে পড়ে এ বছরই জানুয়ারির এক সন্ধ্যাবেলা আমি ৭ নম্বর ওয়াইজঘাটের বুলবুল মেমোরিয়াল কমিটির অফিসে বসে আছি। এ সময়ে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ আমাদের অফিসে এলেন। ওস্তাদকে খুবই বিমর্ষ ও উত্তেজিত দেখলাম। আমি বিনীতভাবে তাঁর কুশল জিজ্ঞাসা করলাম । তিনি বললেন, আমার দেশে থাকা আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। আমার পীড়াপীড়িতে তিনি তাঁর
খুলে বললেন।
ঘটনাটি হলো: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দেশের বাড়িতে কয়েকদিন থাকার সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পাঞ্জাবি এস ডি কদিন একজন পেয়াদাকে তাঁর কাছে পাঠান। উদ্দেশ্য হলো, এস ডি ও র বাংলোতে আগত মেহমানদের আপ্যায়নের গান বাজনার আসরে তাকে অংশগ্রহণ করতে হবে। পেয়াদা পাঠিয়ে ডেকে পাঠানোর অপমান ওস্তাদ আলাউদ্দি পার মনে খুবই লেগেছিলো। এরপর তিনি কালবিলম্ব না করে কুমিল্লা হয়ে ঢাকায় চলে আসেন। আমাকে বললেন, বা, তুমি একটু আমাকে প্লেনের টিকিটের ব্যবস্থা করো, যাতে আমি কাল সকালেই কলকাতা চলে যেতে পারি। সেখান থেকে আমাকে
মাইহার যেতে হবে।”
ওস্তাদকে আমি অফিসের উপরের তলায় নিয়ে থাকার ব্যবস্থা করি। সেবার তিনি ঢাকায় আর কারো বাসায় যেতে চাননি। পরের দিন সকাল বেলা তাঁকে আমি প্লেনে তুলে দিই I
১০ বুলবুল স্মৃতি সম্মেলন
১লা জানুয়ারি ১৯৫৫ তারিখে বুলবুলের জন্মদিনে অনুষ্ঠিত বুলবুল স্মৃতিদিবসে বুলবুল স্মৃতি সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। স্থানীয় সংবাদপত্রগুলো আমাদের সিদ্ধান্ত, উদ্যোগ ও কর্মসূচির কথা স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রচার করে সম্মেলন সফল করার কাজে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলো। এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর দুই পুত্র সফিউল্লাহ ও জাকিউল্লাহ সাহেবের আন্তরিক সহযোগিতা । তাঁরা তাঁদের রেনেসাঁ প্রিন্টার্স থেকে অনেকটা বিনা পয়সায় সম্মেলন সম্পর্কিত কাগজপত্র ছেপে দিয়েছিলেন। মেসার্স গোসেন অ্যান্ড কোম্পানি কোনোরূপ মজুরি ছাড়াই সম্মেলনের যাবতীয় বিদ্যুতায়নের কাজ করে দিয়েছিলো। এ কোম্পানির মালিকের নাম ছিলো হেমন্তকুমার ঘোষ (মানিক ঘোষ) । হেমন্তকুমার ঘোষ ঢাকার ব্রাহ্ম সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন।
সম্মেলনে নৃত্য পরিবেশনের জন্য বুলবুলের নৃত্যের দলটিকে পুনরায় সংগঠিত করার প্রয়োজন হয় । আফরোজা বুলবুল এ ব্যাপারে এগিয়ে আসেন । দলের অধিকাংশ লোকই ছিলেন কলকাতায়। আফরোজা বুলবুল কলকাতা গিয়ে তাঁদের সংগঠিত করেন। তাঁর যাতায়াত খরচ, বাদ্যযন্ত্র, পোশাক, গয়নাগাটি, স্মরণিকার ব্লক তৈরি প্রভৃতি কাজের জন্য তাঁকে ঐ সময়ে ৩৫০০ টাকা দেওয়া হয়েছিলো। এছাড়া স্মরণিকার জন্য কলকাতার কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তির বাণী জোগাড়ের দায়িত্বও তাঁকে দেওয়া হয়েছিলো যেসব ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বুলবুলের ঘনিষ্ঠতা ছিলো । টাকা পাঠাতে কয়েকদিন দেরি হলে কলকাতায় আফরোজা বুলবুল খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
আফরোজার এ চিঠি পেয়েই আমি তাঁকে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলাম। এদিকে মোহাম্মদ মোদাব্বেরকে স্মৃতি সম্মেলনের স্মরণিকা সম্পাদনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁর সম্পাদনায় যথাসময়ে স্মরণিকাটি প্রকাশিত হয়। স্মরণিকাটিতে বুলবুলের শুভানুধ্যায়ী বিখ্যাত ব্যক্তিদের শুভেচ্ছা বাণী, বুলবুলের জীবনী, দেশ বিদেশে তাঁর বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ছবি, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর সম্পর্কে প্রকাশিত মন্তব্য প্রভৃতি ছাপা হয়েছিলো।
৭নং ওয়াইজঘাট
বুলবুল স্মৃতি সম্মেলনের প্রস্তুতির সঙ্গে সঙ্গে প্রস্তাবিত বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর জন্য একটা সুন্দর জায়গা খুঁজছিলাম। অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠার উপযোগী জুৎসই কোনো জায়গা পাওয়া যাচ্ছিলো না। হঠাৎ একদিন খবর পেলাম, ৭ নং ওয়াইজ ঘাটের বাড়ি, যেটা পূর্ব বাংলা সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের হেড-অফিস ছিলো, গণপূর্ত বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাড়িটি ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় সেখান থেকে তাঁরা অন্যত্র চলে যান। এর ফলে বাড়িটি কয়েক মাস ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকে।
এ বাড়ির একটা ইতিহাস আছে। বাড়িটি Indigo কোম্পানির পর্তুগিজরা তাঁদের নীল ব্যবসার অফিস হিসেবে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে প্রায় দুই শত বছর আগে তৈরি করেছিলেন। বাড়িটির নাম ছিলো নীল-কুটির। পরবর্তীকালে বাড়িটি হিন্দু জমিদার ঘোষ-বোসদের দখলে এসে যায় । ব্রিটিশ শাসন-আমলেই এক সময়ে এটি দেবোত্তর সম্পত্তিরূপে পরিগণিত হয়। বুড়িগঙ্গার তীরে ঢাকার নবাবদের বাসস্থান আহসান মঞ্জিলের (বর্তমানে জাদুঘর) সন্নিকটে এই নীল-কুটির ছিলো। নবাব স্যার সলিমুল্লাহ বোসদের নিকট থেকে এই দেবোত্তর বাড়িটি (নীল কুটির) ৬০ বৎসরের জন্য ইজারা নিয়েছিলেন, নগর স্টেটের chief manager Mr. Wise (অবসরপ্রাপ্ত ICS)-এর বাসস্থানের জন্য। Mr. Wise-এর বসবাসের সুবিধা ব নবাব স্টেট বাড়িটির সংস্কার সাধন করে। এ বাড়িটি প্রায় ১ একর জমির উপর অবস্থিত । নবাবদের ইজারা শেষ হবে
আগেই পূর্ব বাংলা সরকার তাদের গোয়েন্দা বিভাগের হেড- অফিসের জন্য রিকুইজিশন করেছিলো। Mr. Wise-এর নাম অনুসারে এই বাড়ির নাম হয় Wise House এবং এ এলাকার রাস্তার নামও হয় ওয়াইজ ঘাট।
পরিত্যক্ত ওয়াইজ হাউসের খোলামেলা আঙ্গিনা আমাদেরকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। আমি আমার সহকর্মীদের নিয়ে একদিন এ বাড়ি দেখতে যাই এবং তখন থেকেই আমাদের মাথায় চিন্তা আসে বুলবুল ললিতকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার জন্য ঠিক এ জাতীয় একটি বাড়ি দরকার । অতঃপর বাড়িটি কিভাবে পাওয়া যায়, সে ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করি এবং ঢাকা জেলা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বারে বারে দেখাসাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকি ।
বুলবুল মেমোরিয়াল কমিটিকে বাড়িটি হস্তান্তর করতে জেলা প্রশাসক রাজি ছিলেন না। এ সময়ে সচিব পর্যায়ের আমাদের এক হিতাকাঙ্ক্ষী আমাদের পরামর্শ দিয়েছিলেন এই বলে যে, প্রথমে তোমরা বাড়িটা দখল করো, তারপর তোমাদের একাডেমীর নামে বাড়িটিকে বরাদ্দ করানোর জন্য তদবিরের চেষ্টা করতে থাকো । সচিব মহোদয়ের নাম আমার এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। তবে সেদিন তাঁর এই বুদ্ধির জন্য তাঁর প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ ।
১৯৫৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বরের দিকে একদিন সন্ধ্যার সময়ে আমি আমার কিছু সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে বাড়িটি দখল করে “বুলবুল ললিতকলা একাডেমী”র সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দিই। বাড়িটির প্রতি অনেক মহারথীরই লোভ ছিলো। এঁদের মধ্যে তখনকার আই জি পুলিশ মি. জাকির হোসেন ও ঢাকার বিখ্যাত মহল্লার সর্দার আবদুল কাদের (কাদের সর্দার, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক কলকাতা থেকে এসে যাঁর বাড়িতে উঠতেন) অন্যতম। এঁরা যৌথভাবে বাড়িটির উপর একটি হোটেল তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। উচ্চ মহলে জাকির হোসেনের খুব প্রভাব প্রতিপত্তি ছিলো। যার বলে পরবর্তীকালে জাকির হোসেন আইয়ুব খাঁর আমলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছিলেন, এক সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরও হয়েছিলেন। জাকির হোসেন এবং কাদের সর্দার আমাকে বাড়িটি ছেড়ে দিতে বহু ধরনের প্রলোভন এবং কখনো কখনো হুমকি দিয়েছেন। আমাকে কোনো রকমে বাড়ি ছাড়তে রাজি করাতে না পারায় তাঁরা জেলা কর্তৃপক্ষের মারফত আমার বিরুদ্ধে “অনধিকার প্রবেশ” মামলা আনয়ন করেন এবং জেলা কর্তৃপক্ষের অফিস থেকে বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার নোটিশ আসতে থাকে ।
এ রকম বেগতিক অবস্থায় বেশ কিছুদিন কাটানোর মধ্য দিয়ে আমাদের হিতাকাঙ্ক্ষীদের সহানুভূতি আমাদের প্রতি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকলো। এসব কারণে বহু প্রতিকূলতা ও বিরুদ্ধ পক্ষীয়দের হুমকির মুখে আমরা আমাদের বহু কাঙ্ক্ষিত বুলবুল ললিতকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার কাজ চালিয়ে যেতে থাকলাম । এই সব প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই আমরা বুলবুলের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী ১৭ই মে ১৯৫৫ তারিখে বিচারপতি মোহাম্মদ ইব্রাহীমকে দিয়ে বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর উদ্বোধন করাই। ১লা জুলাই আমরা বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর ক্লাস উদ্বোধন করিয়েছিলাম পূর্ব পাকিস্তান সরকারের মুখ্য সচিব এন এম খানকে দিয়ে। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই মি. জাকির হোসেন এবং কাদের সর্দার এন এম খানকেও প্রভাবিত করতে সক্ষম হন, যার ফলে আমি খুব উদ্বিগ্নতার মধ্য দিয়ে কাল কাটাতে থাকি। তবে পূর্ববঙ্গ সরকার বুলবুল সম্মেলন করার সময়ে এ বাড়িতে আফরোজা বুলবুল ও তাঁর দলবলকে থাকার জন্য সাময়িক অনুমতি দিয়েছিলেন । ১০ই আগস্ট ১৯৫৫তে বগুড়ার মোহম্মদ আলী পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী হন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ঢাকা সফরে আসেন । মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে কলকাতা থেকেই আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিলো । প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এই পরিচয়ের সূত্রটি কাজে লাগাতে চাইলাম। ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহীমের (তখনকার বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর অন্যতম পৃষ্ঠপোষক, কলকাতার জীবনে মোহাম্মদ আলীর পারিবারিক চিকিৎসক এবং পরবর্তীকালে ঢাকার বিখ্যাত ডায়েবেটিক হাসাপাতালের প্রতিষ্ঠাতা) নেতৃত্বে আমরা মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে দেখা করবো বলে স্থির হয়। কিন্তু মোহাম্মদ আলী ঢাকায় এসে এতো ব্যস্ত ছিলেন যে, আমাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় দিতে পারেননি। অগত্যা ডা. ইব্রাহীমের বুদ্ধিমতো আমরা তেজগাঁ বিমানবন্দরে এসে মোহাম্মদ আলীর জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। মোহাম্মদ আলীর বিমানে ওঠার প্রাক্কালে ডা. ইব্রাহীম আমাদের নিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেলেন। দেখা করে আমরা আমাদের সমস্যা বিশেষ করে ওয়াইজ হাউসটিকে বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর নামে বরাদ্দ করার জন্য আবেদনপত্র পেশ করি। আবেদনপত্রের উপর তিনি পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্য সচিবকে মার্ক করে লিখে দিলেনড় “Wise House may be alloted in fauvour of BAFA." তখন মুখ্য সচিব এন এম খান পাশেই ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী নিজেই দরখাস্তখানা তাঁর হাতে দিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেন। বাড়িটি এভাবে পাওয়াতে সেদিন আমরা যে কী পরিমাণে আনন্দিত হয়েছিলাম, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আফরোজা বুলুবল ১৯৫৪ সালের ডিসেম্বরেই কলকাতা থেকে দলবল নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। এবার ঢাকায় এলে তাঁকে তাঁর সঙ্গীদের সহযোগে দখলকৃত ওয়াইজ হাউজে তুলে দিই। বাড়িটি দখল করার পর এটিকে বসবাসের উপযোগী করে তুলতে আমাদেরকে বেশ কয়েকদিন কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। এ সময়ে বুলবুল স্মৃতি সম্মেলনের অজুহাতে পূর্ববঙ্গ সরকারের নিকট থেকে আফরোজা বুলবুল ও তাঁর সঙ্গীদের থাকবার সাময়িক অনুমোদন সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। এই অস্থায়ী অনুমোদন বাড়িটির উপর আমাদের দখলি-স্বত্ব তৈরি হতে সহায়ক হয়েছিলো।
বুলবুল স্মৃতি সম্মেলন
৫ দিন ব্যাপী বুলবুল স্মৃতি সম্মেলনের সূচনা হয় ১লা ফেব্রুয়ারি ১৯৫৫ তারিখ বিকেল সাড়ে চারটায় বুলবুল প্রদর্শনী উদ্বোধনের মাধ্যমে। ৭নং ওয়াইজ ঘাটের ওয়াইজ হাউসের নীচ তলার বৃহদাকার হল ঘরে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা। হয়েছিলো। প্রদর্শনী উদ্বোধন করার কথা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর অনুপস্থিতিতে জনাব মিজানুর রহমানকে দিয়ে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। মিজানুর রহমান ছিলেন এ সম্মেলনের প্রদর্শনী কমিটির সভাপতি। মিজান সাহেবের গ্রামের বাড়ি ছিলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া । তিনি সরকারি চাকরিতে যুগ্ম সচিব পর্যন্ত হয়েছিলেন বুলবুল স্মৃতি সম্মেলনের এ প্রদর্শনী ছিলো অতীব হৃদয়গ্রাহী । সারাটা হলঘর আফরোজা বুলবুলের নেতৃত্বে তাঁর দলের শিল্পীদের দ্বারা মনোরমভাবে সাজানো-গোছানো হয়েছিলো। বুলবুলের ব্যবহৃত নৃত্যের পোশাক-পরিচ্ছদ, অলংকার, বাদ্যযন্ত্র, দেশে-বিদেশে পরিবেশিত অনুষ্ঠানাদির ছবি, নৃত্যনাট্যে ব্যবহৃত বিভিন্ন রঙের পর্দা প্রভৃতি প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছিলো। আফরোজা বুলবুল ও তাঁর দলের শিল্পীরাই প্রদর্শনীতে আগত দর্শকদের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন এবং দেখাশুনা করেছেন। ১ তারিখ ও ২ তারিখ দৈনিক ৭ ঘণ্টা করে মোট ১৪ ঘণ্টা এই প্রদর্শনী খোলা রাখা হয়েছিলো ।
প্রদর্শনীর শেষ দিন অর্থাৎ ২রা জানুয়ারি ১৯৫৫ তারিখে ওয়াইজ ঘাটে আমরা একটি সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করি। সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে আমি এখানে বক্তব্য রেখেছিলাম। বুলবুলের স্ত্রী হিসেবে আফরোজা বুলবুলও আগত সাংবাদিকদের নানা রকম প্রশ্নের জবাব দেন। আমরা উভয়েই অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বুলবুলের অন্তিম ইচ্ছা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি তথা তাঁর নামে একটি অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠার কথা জ্ঞাপন করি। একইভাবে আমাদের সে সময়ের পরিকল্পনা ও কর্মসূচিকে সাধারণের কাছে পৌছে দেওয়ার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলাম। সাংবাদিকগণও আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বুলবুল স্মৃতি সম্মেলনের যাবতীয় অনুষ্ঠানকে তাঁদের নিজ নিজ প্রচার মাধ্যমে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করেছিলেন।
৩রা ফেব্রুয়ারি ১৯৫৫ তারিখ সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে মূল অধিবেশন বসে। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছিলেন ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন। ঐতিহাসিক এ সভায় উপস্থিত ছিলেন শহরের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীগণ, সাংবাদিকবৃন্দ, শিল্পী ও সাহিত্যিকবৃন্দ। বিপুল সংখ্যক মহিলারাও উপস্থিত ছিলেন। পাকিস্তানের জাতীয় শিল্পীরূপে বর্ণনা করে অকালপ্রয়াত বুলবুল চৌধুরীর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে অনুষ্ঠানের শুরুতেই এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। দেশ-বিদেশের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব এ সম্মেলন উপলক্ষে যে-সব শুভেচ্ছা-বাণী পাঠিয়েছিলেন, তারমধ্যে থেকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বাণীকে বেছে নিয়ে আমি তা সমবেত সুধীবৃন্দকে পড়ে শুনাই। বিচারপতি মোহাম্মদ ইব্রাহীম সভার সভাপতিত্ব করবেন বলে নির্ধারণ করা হয়েছিলো, কিন্তু তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁর জায়গায় ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেনকে সভাপতি মনোনীত করা হয়। তবে বিচারপতি ইব্রাহীম তাঁর এক চিঠিতে তিনি সম্মেলনের প্রতি তাঁর সার্বিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন এবং সম্মেলনের সফলতা কামনা করেন। সম্মেলনের যেসব শুভেচ্ছা বাণী এসেছিলো এবং যা এ অন্তানে আমি পাঠ করি।
৩রা ফেব্রুয়ারির এ সভায় প্রয়াত বুলবুল চৌধুরীর জীবনের উপর এবং বুলবুল স্মৃতি সম্মেলনের প্রস্তুতি কমিটির কর্মকাণ্ড ব্যাখ্যা করে কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে আমি বক্তব্য রাখি। প্রস্তুতি কমিটির সভাপতিরূপে বেগম শামসুন নাহার মাহমুদও বুলবুল চৌধুরীর জীবন ও সাধনার উপর বিশেষ আলোকপাত করেন । এছাড়া ৩রা ফেব্রুয়ারির এ সভা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ছিলো এ কারণে যে, এই সভাতেই বুলবুল ললিতকলা একাডেমি (Bulbul Academy of Fine Art / BAFA), প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়েছিলো এবং এ প্রস্তাব কার্যকরী করার লক্ষ্যে বুলবুল স্মৃতি কমিটি (Bulbul Memorial Committee) নামে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিলো।
উক্ত সভার কার্যবিবরণীর ২ নং এবং ৩ নং অনুচ্ছেদ ছিলো নিম্নরূপ (মূল ইংরেজিতে)। এই কার্যবিবরণীতে দেখা যাবে বুলবুল ললিতকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার মুহূর্তে আমাদের সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা কেমন ছিলো এবং সে কমিটিতে কারা কারা ছিলেন:
২। এই সভা বুলবুল চৌধুরীর স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বুলবুলের আজীবনের স্বপ্ন ললিতকলাকে উৎসাহিত করে ঢাকায় একটি অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠার বিষয়কে জাতীয় প্রযোজনরূপে গণ্য করে, যার নাম হবে বুলবুল অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস বা বুলবুল ললিতকলা একাডেমি (BAFA), এই নামে স্বতন্ত্রভাবে বা অন্য কোনো সংস্থার বা ব্যক্তির সহযোগিতায় যে-কোনো স্থানে এর শাখা খোলা যাবে।
৩। উপরে বর্ণিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য এই সম্মেলন 'বুলবুল মেমোরিয়াল কমিটি' নামে একটি কমিটি গঠন করে, যাতে নিম্নোক্ত সদস্যগণ অন্তর্ভুক্ত, প্রয়োজনে এই সদস্যগণ নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে পারবেন, উপায় ও পদ্ধতি বের করে অভীষ্ট লক্ষ্যের জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবেন। পাঁচ সদস্যের উপস্থিতিতেই কোরাম হবে ।
সদস্যগণ নিম্নরূপ:
১। সভানেত্রী বেগম রানা লিয়াকত আলী খান
২। কার্যকরী সভাপতি মাননীয় বিচারপতি মোহাম্মদ ইব্রাহীম
৩। সহসভাপতিবৃন্দ জনাব মিজানুর রহমান, বেগম শামসুন নাহার মাহমুদ, জনাব আবুল কালাম শামসুদ্দীন, জনাব আবদুস সালাম
৪। সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ নূরুল হুদা
৫। যুগ্ম সম্পাদকবৃন্দ-বেগম মিজানুর রহমান, মিসেস বাসন্তী গুহঠাকুরতা
৬। প্রচার সম্পাদক জনাব মোহাম্মদ মোদাব্বের
৭। কোষাধ্যক্ষ বেগম আনোয়ারা বাহার চৌধুরী
৮। সদস্যবৃন্দ জনাব মোহাম্মদ নোমান (করাচি )
৮ । শ্রী সুনীলকুমার বসু
৯। জনাব এ এইচ মাহমুদ
১০ । ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন
৪ঠা ফেব্রুয়ারি ভারতেশ্বরী হোমসের মেয়েরা ‘আলীবাবা’ নামে একটি নৃত্যনাট্য পরিবেশন করে। উল্লেখ্য যে, ভারতেশ্বরী হোমসের প্রতিষ্ঠাতা রায়বাহাদুর রণদাপ্রসাদ সাহা সম্পূর্ণ নিজ ব্যয়ে দলটি পাঠিয়েছিলেন ।
সম্মেলনের শেষ দিন ৫ই ফেব্রুয়ারি আফরোজা বুলবুল ও তার দল নৃত্যনাট্যসহ একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে। সভাশেষে আমি দর্শকদেরকে ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য রেখেছিলাম, যেখানে বলেছিলাম, “বুলবুলহীন বুলবুলের দলের উপস্থাপনায়কোনো দোষত্রুটি থাকলে তা ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখবেন।” প্রস্তুতি কমিটি ১০০ পৃষ্ঠার যে স্মরণিকা বের করে, এ সময়ে আমি সে সম্পর্কেও একটি ঘোষণা দান করি ।
বুলবুল স্মৃতি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবার পর আমরা অত্যন্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে বুলবুল ললিতকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ শুরু করে দিই। কমিটির কয়েকটি মিটিং- এ কাজের সুবিধার জন্য যাঁদেরকে কোঅপ্ট করা হয়েছিলো, তাঁরা হলেন বেগম আফরোজা বুলবুল, বেগম এম এ মজিদ, বেগম সানোয়ার আলী, ড. মোহাম্মদ ইব্রাহীম, সৈয়দ মোহম্মদ হোসেন, জনাব আহমদ হোসেন, জনাব আনিসুজ্জামান, জনাব মোতাহের হোসেন চৌধুরী, জনাব কাজী মোহাম্মদ ইদরিস, জনাব বাহাউদ্দীন চৌধুরী, জনাব এস এম পারভেজ, জনাব এম এ মোহায়মেন, জনাব মসিউর রহমান, এ জেড হামি, বেগম বি আহমেদ, বেগম এ জেড হায়দার, খাদেম হোসেন খান, বেদারউদ্দীন আহমদ প্রমুখ।
বুলবুল স্মৃতি কমিটির প্রাথমিক পর্যায়ে পর পর তিন জন কার্যকরী সভাপতিরূপে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, এঁরা হলেন, বিচারপতি জনাব মোহাম্মদ ইব্রাহীম, বিচারপতি জনাব মাহবুব মোরশেদ এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রী আজিজুল হক নান্না মিয়া । এছাড়া বেগম রানা লিয়াকত আলী খান সভাপতিত্ব না করেও সুদূরে থেকে এ প্রতিষ্ঠানের জন্য চিঠিপত্রের লবুল ললিতকলা একাডেমি গঠনের প্রস্তুতি
বুলবুল স্মৃতি সম্মেলন হওয়ার পরে ১৯৫৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি মোহাম্মদ ইব্রাহীমের বাসভবনে তাঁরই সভাপতিত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন হয়। ঐ দিনের সভায় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, বুলবুলের স্ত্রী বেগম বুলবুল স্মৃতি সম্মেলন হওয়ার পরে ১৯৫৫ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি বিচারপতি মোহাম্মদ ইব্রাহীমের বাসভবনে তাঁরই আফরোজা বুলবুলকে পরিকল্পিত এ অ্যাকাডেমির প্রিন্সিপাল করা হবে। এছাড়া ৭ নং ওয়াইজ ঘাটের যেখানে আফরোজা বুলবুলের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো, ঐ বাড়িটিই যাতে বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর নামে সরকার থেকে বরাদ্দ করানো যায় সেই লক্ষ্যে উদ্যোগ গ্রহণের সিদ্ধান্তও এ সভায় গৃহীত হয়েছিলো। এরপর থেকে বুলবুল মেমোরিয়াল কমিটি তার যাবতীয় সভা ৭ নম্বর ওয়াইজঘাটের বাড়িতেই করেছে। উক্ত বাড়িটি আমরা কিভাবে লাভ করেছিলাম, সে সম্পর্কে পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে।
১৯৫৪ সালের মে মাসের ১ তারিখের সভায় আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে, বুলবুলের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতেই আমরা বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করবো এবং এই দিন থেকেই বুলবুলের স্ত্রী আফরোজা বুলবুল উত্ত প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপালরূপে তাঁর দায়িত্ব পালন করবেন। বুলবুল মারা যাওয়ার পর মাত্র এক বছরের মধ্যে তাঁর নামে একটি প্রতিষ্ঠান উদ্বোধন করানোর পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে আমাকে যে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছিলো তা সহজেই অনুমেয়। এ সময়ে আমি প্রতিদিন সকাল ৮টায় বাসা থেকে বের হতাম এবং প্রায় দিনই রাত ১০টার আগে বাসায় ফিরতে পারতাম না। দুপুরের খাবার খেতাম বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর অফিসে বসে। নিকটস্থ ওয়াইজঘাটের সাভার বোর্ডিং থেকে টিফিন কেরিয়ারে করে ভাত আনাতাম । নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ার নেশা আমাকে এমনভাবে পেয়ে বসেছিলো যে, সাপ্তাহিক ছুটি তো বটে ঈদের দিনেও আমি অফিসে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাজকর্ম করতাম।
বুলবুল ললিতকলা একাডেমির উদ্বোধন
১৯৫৫ সালের ১৭ই মে বুলবুলের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর উদ্বোধন করা হয়। ৭ নং ওয়াইজঘাটের এ জনাকীর্ণ অনুষ্ঠানে বিচারপতি মোহাম্মদ ইব্রাহীম অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেছিলেন অনুসন্ধান-বিশারদ ডঃ আবদুল গফুর সিদ্দিকী। পূর্ববঙ্গ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খান ছিলেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি । অ্যাকাডেমির প্রস্তাবিত প্রিন্সিপাল আফরোজা বুলবুল এবং আমি বুলবুল স্মৃতি কমিটির সেক্রেটারি হিসেবে বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর উদ্দেশ্য ও আদর্শ ব্যাখ্যা করি। অন্যান্য বক্তার মধ্যে ছিলেন। জনাব আতাউর রহমান খান ও জনাব কামরুদ্দীন আহমেদ। এছাড়া উদ্বোধন অনুষ্ঠান উপলক্ষে দেশ- বিদেশের বহু বরেণ্য ব্যক্তি শুভেচ্ছা বাণী পাঠিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে বেগম রানা লিয়াকত আলী খান, রাষ্ট্রদূত টি আলী (তফাজ্জল আলী), হাইকমিশনার হাবিবুর রহমান, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, আবু হোসেন সরকার, এন এম খান, শ্রী নিরঞ্জন সেন প্রমুখ। এ উপলক্ষে বাণী পাঠিয়েছিলেন ইরানের শাহ রেজা শাহ পাহলবী (His Emperial Majestry the Shahinshah of Iran, Reza Shah Pahlavi Aryamihir), তিনি তাঁর সই করা একটি ছবিও পাঠিয়েছিলেন। করাচিতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূতও ইরানের শাহের বাণীর সঙ্গে আলাদা একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন এবং আমাদের উদ্যোগকে উৎসাহিত করেছিলেন। উল্লেখ্য যে, বুলবুল ললিতকলা একাডেমী উদ্বোধনের পূর্বেই ৭ নং ওয়াইজঘাটের এই বাড়িটি আমরা পূর্ববঙ্গ সরকারের কাছ থেকে সাময়িকভাবে বন্দোবস্ত আদায় করতে সক্ষম হয়েছিলাম।
বুলবুল ললিতকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার পর প্রথমেই শিক্ষক সমস্যা সমাধানের বিষয়টি আমাদের ভাবিয়ে তোলে । তৎকালীন পূর্ববঙ্গে ললিতকলার শিক্ষক হবার মতো উপযুক্ত ব্যক্তি এক রকম ছিলেন না বললেই চলে । এ অভাব পূরণের জন্য আমরা বুলবুলের দলে ছিলেন, এমন কয়েকজন শিল্পীর কথা চিন্তাভাবনা করি । কিন্তু তাঁদের মধ্যে অনেকেই স্থায়ীভাবে কিন্তু গতায় বসবাস করেন বলে ঢাকায় এসে শিক্ষকতা করতে রাজি হননি, অনেকে খুব বেশি টাকা বেতন দাবি করেও আমাদেরকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন । তবে শেষ পর্যন্ত অজিত স্যানাল এবং খাদেম হোসেন খান বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর শিক্ষক হতে রাজি হন। অজিত স্যানালের পৈতৃক বাড়ি ছিলো ফরিদপুর, নৃত্যের ওপর তাঁর বিশেষ দখল ছিলো, এজন্য তাঁকে আমরা নৃত্য শাখার দায়িত্ব দিয়েছিলাম। খাদেম হোসেন খান উপমহাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের ভ্রাতুষ্পুত্র এবং মাইহারে থেকে আলাউদ্দিন খাঁর নিকট সঙ্গীতে তালিম নিয়েছিলেন, তাঁকে আমরা প্রথমত যন্ত্রসঙ্গীতের ভার দিয়েছিলাম । পরবর্তীকালে তিনি বিশেষভাবে সেতারের শিক্ষক হন।
বুলবুলের সহকর্মীদের মধ্যে তাঁর স্ত্রী ছাড়া আর মাত্র দুজন শিল্পীকে পাওয়া গেলেও, ঢাকার শিল্পীদের মধ্য থেকে আমরা ব্যাপক সাড়া পাই। ঢাকার শিল্পীদের অনেকেই সামান্য যাতায়াত-খরচের বিনিময়ে (মাসে ৩০ টাকা) বুলবুল ললিতকলা একাডেমীতে এসে সঙ্গীত শিক্ষা দিতে আন্তরিকভাবে রাজি হয়েছিলেন।
প্রাথমিক পর্যায়ে তখন যাঁরা শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন, তাঁদের মধ্যে বেদারউদ্দীন আহমদ, মুনশী রইসুদ্দীন, ইউসুফ খান কোরেশী (ওস্তাদ গুল মুহম্মদ খানের বড়ো ছেলে), শেখ লুৎফর রহমান, আবদুল লতিফ, নিখিল দেব, মাহবুবা হাসনাত
(খান আতাউর রহমানের প্রথম স্ত্রী, যিনি হিন্দু ছিলেন), ফুলঝুরি খান, মি. মোস্তফা (ময়না), ওয়ারেস আলী, বজলুল করিম, লায়লা আর্জুমন্দ বানু প্রমুখ। পরবর্তী পর্যায়ে কলিম শরাফী, বোরহান আহমেদ, আবদুল হালিম চৌধুরী, সাদেক আলী, মমতাজ মিয়া, রমণীমোহন দাস, আদিনাথ গোপ, এইচ ব্যানার্জি ও ইয়াকুব খান বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর শিক্ষক হয়েছিলেন। আবদুল আহাদ বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষকরূপে যোগ না দিলেও নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। কয়েক বছর পরে তিনি বুলবুল ললিতকলা একাডেমীতে যোগ দিয়েছিলেন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। প্রতিষ্ঠানের এই প্রাথমিক লগ্নে অফিসের বহু দাপ্তরিক কাজ অনেকটা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে (নামমাত্র পারিশ্রমিকে) করে দিয়েছেন মিসেস সালেহা বেগম। তাঁর স্বামীর নাম ছিলো ড. এস বি চৌধুরী।
৫ ১৯৫৫ সালের ১লা জুলাই বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর ক্লাশ শুরু হয়। ক্লাশ শুরু হওয়ার দিনটিকেও আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করি। তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান সরকারের চিফ সেক্রেটারি এন এম খান (নিয়াজ মোহাম্মদ খান, আই সি এস) ক্লাশ উদ্বোধন করেন। বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব ঘটনাকেই আমরা তখন বেশ আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন করতাম এবং পারতপক্ষে সরকারের মন্ত্রী বা দায়িত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের তার সঙ্গে জড়াতে চেষ্টা করতাম । এর ফলে নবগঠিত বুলবুল ললিতকলা একাডেমী একটা বাড়তি প্রচারের সুবিধা পেয়ে যেতো, এবং যা আমরা প্রত্যাশা করতাম। এ সময়ে আমি যেসব প্রেসবিজ্ঞপ্তি দিতাম তার মধ্যেও বহু অতিরঞ্জন থাকতো। বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর স্বার্থেই বুঝে শুনেই তা আমি করতাম। যেমন- অজিত সান্যালকে আমি একবার বিখ্যাত সাহিত্যিকরূপে বিশেষিত করে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলি যে, তিনি নৃত্যবিভাগে যোগদান করেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তখনো পর্যন্ত অজিত সান্যালের কোনো বই প্রকাশিত ছিলো না। অবশ্য পরবর্তীকালে তাঁর দুইটি বই (দুই দেশ দুই মন, আলোর পাখি) প্রকাশিত হয়েছে। জানি না আমার সেদিনকার অতিরঞ্জন খণ্ডানোর জন্যেই পরবর্তীকালে অজিত সান্যাল বই দুটো লিখেছিলেন কিনা। এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৫৫ সালের ১৭ই মে বুলবুলের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর উদ্বোধন দিবসে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খানকে প্রধান অতিথি করে আমন্ত্রণ জানানোর ফলে তিনি তাঁর মন্ত্রীসভার সদস্যদের নিয়ে উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আসেন, মন্ত্রীসভার বয়োকনিষ্ঠ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমানও সেদিন তাঁর সঙ্গে ছিলেন । স্বাভাবিকভাবেই ঐদিন রেডিওতে এবং পরের দিন দেশের সব খবরের কাগজগুলোতে আমাদের খবর ফলাও করে ছাপা হয়েছিলো ।
বুলবুল ললিতকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই এ প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল হওয়ার জন্য আফরোজা বুলবুলকে প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে তিনি কাগজে-কলমে ১৯৫৫ সালের ১লা অক্টোবরে প্রিন্সিপালরূপে কাজে যোগ দেন। কাজে যোগদান করার পূর্বে কয়েকমাস ধরে তিনি কলকাতায় অবস্থান করছিলেন। আফরোজা বুলবুলের মনে হয়তো এ জাতীয় একটা দ্বন্দ্ব কাজ করে ছিলো যে, ঢাকায় এমন একটা দায়িত্ব গ্রহণ করলে তাঁর পক্ষে দল গঠন ও দল নিয়ে বিদেশ সফর করার বিঘ্ন ঘটতে পারে ।
বুলবুল ললিতকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার পর থেকে স্থায়ী গভর্নিং বডি গঠিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর যাবতীয় দায়িত্ব “বুলবুল মেমোরিয়াল কমিটি”-র হাতে ন্যস্ত ছিলো। বিষয়টি ১৯৫৫ সালের ২৮শে অক্টোবরে কার্যকরী কমিটির সভাতেও পাশ করিয়ে নেওয়া হয়েছিলো ।
পাকিস্তান শিল্পী সম্মেলন (কনভেনশন)
বুলবুল স্মৃতি কমিটি শুধু বুলবুল ললিতকলা একাডেমী পরিচালনার মধ্যেই তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখতে চায়নি। হঠাৎ আমাদের মনে হয়েছে, একজন বুলবুল মারা গেলেও সমাজে যে অসংখ্য বুলবুল জীবিত রয়েছে, তাঁদের উৎসাহিত করার জন্যও কিছু করা দরকার। বুলবুল স্মৃতি কমিটির উদ্দেশ্যাবলির মধ্যেও সেকথা ছিলো। একথা ভেবে বুলবুল স্মৃতি কমিটির পক্ষ থেকে প্রথমে আমরা ঢাকার নেতৃস্থানীয় কিছু শিল্পীকে নিয়ে একটা বৈঠক করি। এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ । ১৯৫৫ সালের ৯ই অক্টোবর অনুষ্ঠিত সভায় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, ঐ বছরের ১৮ই, ১৯শে ও ২০শে নভেম্বরে পূর্বপাকিস্তান, পশ্চিম পাকিস্তান ও ভারতের বিশিষ্ট সাহিত্যিকদের নিয়ে একটা শিল্পী সম্মেলন করবো, যার নাম হবে পাকিস্তান শিল্পী সম্মেলন বা Pakistan Artist Convention । সম্মেলন সফল করার লক্ষ্যে এ উপলক্ষে আমরা একটি অভ্যর্থনা কমিটি গঠন করেছিলাম। কমিটিটি ছিলো নিম্নরূপ :
চেয়ারম্যান সৈয়দ আজিজুল হক নান্না মিয়া, ভাইস চেয়ারম্যান বেগম আফরোজা বুলবুল, ওস্তাদ গুল মোহাম্মদ খান, প্রিন্সিপাল জয়নুল আবেদীন মুন্সী রইসউদ্দীন, সেক্রেটকরি আব্বাসউদ্দীন, জয়েন্ট সেক্রেটারি অজিত সান্যাল, খাদেম হোসেন খান, সহকারী সেক্রেটারি বেদারউদ্দীন, আবদুল লতিফ, কামেলা শরাফী, খালেদা ফ্যান্সী খানম সদস্যবৃন্দ ইউসুফ খান কোরেশী, লায়লা আর্জুবান্দ বানু, আবদুল আহাদ, ফতেহ লোহানী, হুসনা বানু খানম, সমর দাস, কলিম শরাফী, রণেন কুশারী, নমিতা আনোয়ার, মাধুরী চ্যাটার্জি, ফরিদা বারী মালিক, সাঈদ সিদ্দিকী, গওহর জামিল, লাফসারি খানম, মতি মিয়া, আবদুল হালিম চৌধুরী, কামরুল হাসান, বজলুল করিম, ওয়ারেস আলী, ফুলঝুরি খান, শেখ লুৎফর রহমান, নির্মল দেব, সাদেক আলী, বোরহান আহমেদ, মাহবুবা হাসনাত, মেহেরুন্নেছা, আদিনাথ গোপ, রমণীমোহন দাস, ইয়াকুব খান, মমতাজ মিয়া, হোসনে আরা, লায়লা সামাদ, প্রীতি আলমগীর, আমিনা মাহমুদ, সেলিনা বাহার, সেলিনা মাহমুদ।
দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া এসব সদস্যদের মধ্য থেকেই আমরা প্রচার সাব-কমিটি, বাজেট সাবকমিটি, প্রোগ্রাম সাবকমিটি মঞ্চ সাবকমিটি প্রভৃতি কমিটি গঠন করেছিলাম। এছাড়া সমন্বয় কমিটিতে আমার সাথে ছিলেন, আনোয়ারা বাহার চৌধুরী, আহমেদ হোসেন, আনিসুজ্জামান এবং সালেহা বেগম ।
ঢাকার ইতিহাসে এ সম্মেলন ছিলো এক অভূতপূর্ব ঘটনা। দেশ-বিদেশের শিল্পীদের একত্রিত করার এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক আদান প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করার এমন উদ্যোগ এর আগে কখনো হয়নি। আমরা পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃস্থানীয় শিল্পীদেরকে এ সম্মেলনে আহ্বান জানিয়েছিলাম। বেশ কয়েকজন ভারতীয় শিল্পীকেও আমরা আমন্ত্রণ জানাই। বেগম রানা লিয়াকত আলী সম্মেলন উদ্বোধন করতে রাজি হন। আফরোজা বুলবুল এ সময়ে কিছু দিনের জন্য কলকাতা অবস্থান করছিলেন । তাঁকে তাঁর দল নিয়ে সম্মেলনে যোগ দিতে বলা হয় ।
সম্মেলন সফল করার লক্ষ্যে আমরা তৎকালীন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের স্বরাষ্ট্র ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে আর্থিক সাহায্য চেয়ে আবেদন করেছিলাম । তাঁরা আমাদের আবেদনে কোনো রকম সাড়া দেননি। বাধ্য হয়ে আমাদের অর্থের জন্য দেশীয় শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবীদের নিকট হাত পাততে হয়। তবে আনন্দের কথা এই যে, এরা তাঁদের সামর্থের বাইরেও আমাদের সাহায্য ও সহযোগিতা করেছিলেন।
১৯৫৫ সালের ১৮ই নভেম্বর শুক্রবার বিকেল ৩টায় তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলন শুরু হয়। অনুষ্ঠানের প্যান্ডেল তৈরি করা হয়েছিলো বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর নিজস্ব ক্যাম্পাসে (৭নং ওয়াইজঘাট)। মেসার্স বি. করিম ডেকোরেটর অনেকটা স্বল্পমূল্যে এই প্যান্ডেল তৈরি করে দিয়েছিলেন। সমকালীন বাজার মূল্যে তিনি যেখানে সহজেই ১৫০০০/= পনেরো হাজার টাকা দাবি করতে পারতেন, সেখানে তিনি আমাদের কাছ থেকে মাত্র সাড়ে চার হাজার টাকা নিয়েছিলেন। উক্ত প্যান্ডেলে ২,০০০ (দুই হাজার) লোকের সংস্থানের ব্যবস্থা ছিলো। বিদেশী অতিথি ও শিল্পীদের থাকা-খাওয়ারও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিলো, যাতে তাঁদের কোনো রকমের অসুবিধা না হয়।
১৮ তারিখ বিকেল ৩টায় অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বেগম রানা লিয়াকত আলী খান । তিনি তখন নেদারল্যান্ডে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ছিলেন । তিনি তাঁর বহু জরুরি কাজকর্ম ছেড়ে বুলবুল মেমোরিয়াল কমিটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমাদের আহ্বানে সাড়া দিতে নেদারল্যান্ড থেকে করাচি হয়ে ঢাকায় চলে আসেন এবং শিল্পী সম্মেলনে যোগ দেন।
প্রথম দিনের এ সভার সভাপতিত্ব করেছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার। বিশেষ অতিথি হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আমীরউদ্দীন আহমেদেরও আসার কথা ছিলো, কিন্তু হঠাৎ অসুস্থতার জন্য তাঁর পক্ষে সম্মেলনের এ দিনে আসা সম্ভব হয়নি। প্রথম দিনের এ সভায় অভ্যর্থনা কমিটির চেয়ারম্যানরূপে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের বাণিজ্য-শ্রম-শিল্প মন্ত্রী সৈয়দ আজিজুল হক সাহেব, অভ্যর্থনা কমিটির সাধারণ সম্পাদকরূপে কণ্ঠশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ, বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর প্রিন্সিপাল হিসেবে বুলবুল চৌধুরীর স্ত্রী নৃত্যশিল্পী আফরোজা বুলবুল, কমিটির কোষাধ্যক্ষরূপে আনোয়ারা বাহার চৌধুরী প্রমুখ বক্তব্য রেখেছিলেন। বুলবুল মেমোরিয়াল কমিটি এবং সম্মেলনের আহ্বায়করূপে সভার শুরুতেই আমাকে একটা বক্তৃতা দিতে হয়েছিলো। উক্ত বক্তৃতায় আমি সমকালীন পাবি ডানের শিল্পীদের ও শিল্পচর্চার সমস্যা সম্পর্কে বিশেষ আলোকপাত করি । সম্মেলনের অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি সৈয়দ অসজুল হকের বক্তব্যটিও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। তাছাড়া আমাদের দুজনের বক্তৃতাই আমরা আগে থেকে তৈরি করে নিয়েছিলাম। শিল্পীদের ও শিল্পচর্চার সমস্যাকে ব্যাপভাবে প্রচারের উদ্দেশ্যে আমাদের বক্তৃতা দুটি মুদ্রিত আকারে লিও করা হয়েছিলো। মনে পড়ে মন্ত্রী সৈয়দ আজিজুল হক সাহেবের বক্তৃতাটির খসড়া তৈরি করে দিয়েছিলেন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের সম্প্রচার বিভাগের পরিচালক জয়নুল আবেদীন সাহেব। অন্যদিকে আমার বক্তৃতাটি তৈরিতে আমাকে বিশেষভাবে সাহায্য করেছিলেন প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, সম্পর্কে সে আমার ভাগ্নে ছিলো। আমাদের উক্ত বক্তৃতা দুটোর ঐতিহাসিক তাৎপর্য আছে বলে আমার মনে হয় । কেননা যে পটভূমিতে আমরা সে সময়ের পাকিস্তানে সংস্কৃতিচর্চা অব্যাহত রেখেছিলাম, বক্তৃতা দুটোর মধ্য দিয়ে আংশিকভাবে হলেও উক্ত পটভূমি অনেকটা প্রকাশিত হবে। অল্প পরেই বক্তৃতা দুটোর বাংলা তর্জমা উদ্ধৃত করা হলো ।মাধ্যমে নানা রকম পরামর্শ দিতেন ও খোঁজ-খবর রাখতেন।
পাকিস্তান শিল্পী সম্মেলন উপলক্ষে দেশ-বিদেশের বহু গুণী-জ্ঞানী ও শিল্পানুরাগী ব্যক্তিবর্গ আমাদেরকে অভিনন্দন জানিয়ে ও উৎসাহিত করে শুভেচ্ছা বাণী পাঠিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে বিশেষভাবে এঁদের নাম করতে হয়, তাঁরা হলেন পাকিস্তান সরকারের গভর্নর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা, ভারতের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডক্টর সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী মোহাম্মদ আলী, ভারতের লোকসভার স্পিকার জি বি মাবালস্কর, পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত স্যার আলেকজান্ডার সাইমন কে সি এম জি ও বি ই, পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স আর্থার জি গার্ডিনার, পাকিস্তানে ইরানের রাষ্ট্রদূত, প্রফেসর শাহেদ সোহরাওয়ার্দী, যুক্তরাজ্যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত এম ইকরামুল্লাহ, পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিচারপতি পি চক্রবর্তী, পাঞ্জাবের প্রধান বিচারপতি এম এ রহমান, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডক্টর পি সি বাগচী, করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ডক্টর এ বি এ হালিম, লাহোর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর এম আফজল হোসেন, প্রখ্যাত নাট্যগুরু শিশিরকুমার ভাদুড়ী, আমস্টার্ডামের (নেদারল্যান্ডের অন্যতম নগরী) বিখ্যাত শিল্পসমালোচক মি সি নিকোলাই এবং মি ডেব্রিক, কলকাতার সাহিত্যিক হিরণকুমার সান্যাল, পাকিস্তানে মিশরের রাষ্ট্রদূত প্রমুখ । এসব শুভেচ্ছা বাণীর সবগুলোই সম্মেলনে পাঠ করে শুনিয়েছিলেন কমিটির অন্যতম সহসম্পাদক সৈয়দ মাহমুদ হোসেন (পরবর্তীকালে তিনি বিচারপতি হয়েছিলেন)। বলা-বাহুল্য এসব শুভেচ্ছা বাণীর জন্য ঐসব ব্যক্তিদের নিকট আমরা চিঠি দিয়েছিলাম এবং তাঁরা খুব আনন্দের সঙ্গেই আমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। আমাদের এভাবে অনেকটা উপযাজক হওয়ার পেছনে বিশেষ কারণ ছিলো।
সমকালীন সমাজে শিল্পচর্চাকে খুব এটা সুনজরে দেখা হয়নি। অশিক্ষিত পরিবার তো দূরের কথা, ঢাকা শহরের বহু আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিগণ তখনো পর্যন্ত ললিতকলা চর্চাকে হয় অপ্রয়োজনীয়, না হয় ধর্মমতে বেদাত মনে করে আসছিলেন। শিল্পী সম্মেলনে যুগের বিখ্যাত ব্যক্তিদের সমর্থন ও অংশগ্রহণ প্রমাণ করাতে পারলে অন্তত শিক্ষিত মহলে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মিশন সফল হবে এটাই ছিলো আমাদের ধারণা। আমাদের বিশ্বাস এতে আমরা যথেষ্ট সফলও হয়েছিলাম ।
সন্ধ্যা নাগাদ সম্মেলন উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয় এবং সন্ধ্যা হতে না হতেই পাকিস্তান শিল্পী সম্মেলনের প্রথম দিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যায়। এই অনুষ্ঠানে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত থেকে শুরু করে, যন্ত্রসঙ্গীত, আধুনিক গান, লোকসঙ্গীত, নৃত্য সবগুলোই একে একে পরিবেশিত হয়। বিদেশী শিল্পীদের মধ্যে শুধুমাত্র কলকাতা থেকেই কয়েকজন শিল্পী এসেছিলেন, পাকিস্তান থেকে কোনো শিল্পী এসেছিলেন বলে মনে পড়ছে না। প্রথম দিনে যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ওস্তাদ আয়াত আলী খান (সুরবাহার), ওস্তাদ গুল মোহম্মদ (উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত), মস্তান গামা (নৃত্য), মুনশী রইসউদ্দীন (উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত), লায়লা আর্জুমান্দ বানু (নজরুল সঙ্গীত), হুসনা বানু খানম (আধুনিক), ফেরদৌসী বেগম (ভাওয়াইয়া), আবদুল আলীম (ভাটিয়ালি), আবদুল হালিম চৌধুরী (পল্লীগীতি), মমতাজ আলী খান (পল্লীগীতি), শীলা মজুমদার (লোকগীতি), সবিতা সেন রায় (রবীন্দ্রসঙ্গীত), জাহান আরা ও আলতাফ হোসেন (আধুনিক), সমর দাস ও তাঁর দল (অর্কেস্ট্রা) প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। এছাড়া আফরোজা বুলবুলের দলের অমিয়কান্তি সরোদ পরিবেশন করেছিলেন। (ইনি ছিলেন বুলবুলের দলের মিউজিক ডাইরেক্টর তিমিরবরণের ভাইপো, এর ডাক নাম ছিলো ভোম্বোল) । বুলবুলের মেয়ে নার্গিস এ অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধ করে। আমাদের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে কলকাতার চার জন নেতৃস্থানীয় শিল্পী সম্মেলনে এসেছিলেন এবং এদিন তাঁরাও গান পরিবেশন করেছিলেন। এঁরা হলেন দেব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, সুখেন্দু গোস্বামী এবং দিপালী নাগ। রবীন্দ্রসঙ্গীতে এঁদের অবদান কালোত্তীর্ণ বিষয়, তাই তাঁদের সম্পর্কে আলাদা কোনো মন্তব্যের প্রয়োজন হয় না। কৌতুক প্রদর্শন করেন আলাউদ্দীন । দুই হাজারের বেশি দর্শক মধ্যরাত পর্যন্ত অভূতপূর্ব এ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি উপভোগ করে আমাদের শ্রম সার্থক করেছিলেন। অনুষ্ঠান সফল করার জন্য আববাসউদ্দীন আহমেদ, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা এবং বাসন্তী গুহঠাকুরতার কঠোর পরিশ্রমের কথা আমার এখনো মনে পড়ে। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন আমরা পাকিস্তানের শিল্পসংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় দিকগুলোর উপর আলোকপাত করার লক্ষ্যে একটি সেমিনারের আয়োজন করি । আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে, দেশের শিল্পসংস্কৃতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে সংস্কৃতিচর্চার পাশাপাশি অ্যাকাডেমিক আলাপ-আলোচনাও একটি অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। সেমিনার শুরু হয় বেলা ২টায়। এর সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর ডক্টর ডব্লিউ এ জেনকিনস। পাকিস্তানের, বিশেষভাবে, পূর্ব পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক ধারার বিভিন্ন দিকের উপর মোট ১২টি প্রবন্ধ পঠিত হয়। কণ্ঠসঙ্গীত ও যন্ত্রসঙ্গীতের উপর মোট ৬টি প্রবন্ধ ছিলো। প্রবন্ধগুলো যাঁরা পড়েছিলেন, তাঁরা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইতিহাস বিভাগের প্রধান ডক্টর আবদুল হালিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন বিজ্ঞান বিভাগের ডিন ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন, এ ইসলাম, আব্বাসউদ্দীন আহমেদ, আবদুল আহাদ, মুনশী রইসউদ্দীন। এরমধ্যে ডক্টর হালিমের প্রবন্ধের নাম ছিলো “The Origin of Kheyal'। অন্যদের প্রবন্ধের নাম মনে করতে পারছি না।
নৃত্য ও নাটকের উপর পঠিত হয়েছিলো আরো ৬টি প্রবন্ধ। যারা পড়েছিলেন, তাঁরা হলেন আফরোজা বুলবুল, অজিত সান্যাল, ফতেহ লোহানী, অজিত গুহ, কামরুল হাসান ও জয়নুল আবেদিন। সভাপতি ডক্টর ডব্লিউ এ জেনকিনসও একটি মনোজ্ঞ ভাষণ দান করেছিলেন।
ঐদিন সকালে বুলবুল মেমোরিয়াল কমিটির একটি বিশেষ মিটিং হয়, যাতে বেগম রানা লিয়াকত আলী সভাপতিত্ব করেন। শিল্পী সম্মেলনের সভাপতি মন্ত্রী আজিজুল হক (নান্না মিয়া) সাহেব মিটিং শেষে রানা লিয়াকত আলীর সম্মানে হোটেল শাহবাগে এক ভোজসভার ব্যবস্থা করেছিলেন। ভোজপর্ব সমাধা করে আমরা সেমিনারে চলে আসি । রানা লিয়াকত আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিটির এ বিশেষ সভায় কমিটির যে সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা হলেন- মিজানুর রহমান,
বেগম বি আহমদ, বাসন্তী গুহঠাকুরতা, সৈয়দ আহমদ হোসেন, সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, মোঃ আবদুল মোহায়মেন, এ জেড হামি, মোঃ মোদাব্বির, আনিসুজ্জামান, শামসুন নাহার মাহমুদ, বেগম মিজানুর রহমান, আফরোজা বুলবুল, এ চৌধুরী, আবদুস সালাম এবং এন মজিদ।
১৯ তারিখ সেমিনারের পর বুলবুল ললিতকলা একাডেমীতে ছাত্রছাত্রীরা একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলো। ২০ তারিখ সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে বিচারপতি মোহাম্মদ ইব্রাহীম সভায় সভাপতিত্ব করেন। বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর জন্য সহযোগিতা প্রত্যাশা করে এদিনও আমি বক্তৃতা রাখি। বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর খসড়া সিলেবাসও আমরা ঐদিন সকলের সামনে উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে সভায় পাঠ করি।
বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা-সদস্যদের নামের তালিকা নিম্নরূপ। যাঁরা বুলবুল চৌধুরীর স্মৃতি চিরস্থায়ী করার জন্য বুলবুল ললিতকলা একাডেমী সংক্ষেপে “বাফা” প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তাঁদেরকেই এই প্রতিষ্ঠাতা-সদস্যের সম্মান দেওয়া হয়েছিলো:
১। বেগম শামসুন নাহার মাহমুদ, এম এ
২। বেগম আনোয়ারা বাহার চৌধুরী
৩। বেগম এন মজিদ
৪। বেগম বদরুন্নেসা আহমদ
৫ । বাসন্তি গুহঠাকুরতা, এম এ বিটি
৬। ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন
৭। মিস সেলিনা চৌধুরী, এম এসসি
৮ । মি. সৈয়দ আজিজুল হক, অ্যাডভোকেট
৯ । ডাঃ ইব্রাহীম এম বি. (ক্যাল)
১০ । মি. জি এ মাদানী, কমিশনার
১১ । মি. মোঃ নোমান এম এ, এল এল বি
১২। মি. এম মহসিন, ডি আই জি পুলিশ
১৩। মি. এম. ডি মোদাব্বের
১৪ । মি. কামরুল হাসান
১৫। মি. এম এ মোহায়মেন, ব্যবসায়ী
১৬। মি. সৈয়দ মাহমুদ হোসেন,
১৭। মি. সৈয়দ আহমদ হোসেন
১৮ । ডক্টর আনিসুজ্জামান
১৯ । মি. মহিদ আলী জমিদার
২০। মি. অজিত সান্যাল, আর্টিস্ট
২১। মি. খাদেম হোসেন খান, আর্টিস্ট
২২। মি. বেদারুদ্দীন আহমেদ, আর্টিস্ট
২৩। মি. মাহমুদ নূরুল হুদা, ব্যবসায়ী
প্রথম দিকে বাফার উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম
বাফা প্রতিষ্ঠার পর থেকে শুধু ছাত্র-ছাত্রীদের ললিতকলা শেখানোর মধ্যেই তার দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখেনি। যে উদ্দেশ্যে এ অ্যাকাডেমির জন্ম হয়, জন্মের পরবর্তী কয়েক বছরের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে তার প্রতিফলনও ঘটে। একদিকে আমরা যেমন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন শিল্পী ও সাংস্কৃতিক দলকে ঢাকার শ্রোতা ও দর্শকদের নিকট পরিচিত করিয়েছি; তেমনি বাফার ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত সংস্কৃতিক দল গঠন করে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে বিভিন্ন দেশে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছি। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম-
১৯৫৫ সনে পাকিস্তান সম্মেলন। বাফা'র আমন্ত্রনে শান্তি ঘোষের নেতৃত্বে ১৯৫৬ সনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্য ও সংগীত শাখার একটি দল ঢাকায় প্রদর্শনী করেন। সম্ভু মিত্রের নেতৃত্বে কলকাতার “বহুরূপী নাট্যসংস্থা” বাফা'য় এসে একাধিকবার নাট্য প্রদর্শন করেন। ১৯৬১ সনে ঢাকায় ৮ দিন ব্যাপি লোকসংগীত ও শিল্প উৎসবের সফল আয়োজন করা হয়। আয়োজনের মধ্যে ছিল পুতুল নাচ, বিচার গান, বিয়ের গীত, রুপবান যাত্রা, বিচ্ছেদ গান, কবি গান, বাঁশি ও হাড়ি বাধন, জারি গান, পালা কৃর্তন গান, মাইজ ভান্ডাড়ী, পাঁচালী, ভাওয়াইয়া, গম্ভিরা, কিচ্ছা, দেহতত্ত্ব, বাইদ্যের গান, ভাব বিচ্ছেদ গান, মনিপুরি নৃত্য, লোক নৃত্য, সাওতাল নাচ ইত্যাদি বাফা ও বিভিন্ন অঞ্চলের আমন্ত্রিত শিল্পীদের উপস্থিতিতে। তাছাড়াও, ১৯৬১ সনে সফলভাবে রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী ঘটা করে উদযাপন করা হয়। সেই সময় বিশেষভাবে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে (গভর্নর আব্দুল মনেম খানের প্রভাব সরকারের উপর ব্যাপক ও গভীর ছিল) কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় চিঠি দেন যে, রবীন্দ্রসংগীত ও নৃত্য বিভাগ বন্ধ করা না হলে বাফা'র গ্রান্ট বন্ধ করা হবে। ১৯৬২ ৭ম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে কবিয়াল রমেশ শীলকে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল। ১৯৭০ সালে শ্রমিক দিবসে ওয়াপদা মিলনায়তনে (মতিঝিল) বাফা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। প্রধান অতিথি ছিলেন, রাষ্ট্রপতি জেনারেল এম.এ. ইয়াহিয়া খান। তাছাড়াও, প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যে বাফা বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নৃত্যনাট্য প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল । নজরুলের কবিতা অবলম্বনে হাজার তারের বীণা, বাদল বরিষনে ও রবীন্দ্রনাথের চন্ডালিকা, মায়ার খেলা, চিত্রাঙ্গদা এবং কবি জসিম উদ্দিনের নকশী কাঁথার মাঠ ইত্যাদি। তাছাড়াও দেশের বাহিরে বাফাকর্মী ও শিল্পীদের নিয়ে সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি হিসেবে ভ্রমণ করেছেন- ইরাক, ইরান, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ইত্যাদি দেশ সমূহে ।
বাফা'র বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সময়ে অতিথি হয়ে এসেছিলেন অনেক শীর্ষ স্থানীয় রাজনীতিবিদগণ তাদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য- হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক, আতাউর রহমান খান, শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ। বিদেশি অতিথিদের মধ্যে চিলেন- চীনের প্রধান মন্ত্রী চু-এন-লাই, চীনের প্রতিষ্ঠাতা- সান-ইয়াৎ সেনের স্ত্রী সুং-চিং-লিং, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট সুন্নাই প্রমুখ ।
বাফা শিশু শিক্ষালয়
এ শতাব্দীর মাঝামাঝি আমাদের দেশে রক্ষণশীলদের সংখ্যা খুব বেশি ছিলো। তাঁরা মনে করতেন সঙ্গীত চরিত্র গঠনের অন্তরায়। এমনকি, তাঁদের ধারণা ছিলো যে, সঙ্গীত অ্যাকাডেমিক লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটায়। প্রচলিত এ ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণিত করার লক্ষ্যে বাফাকে কেন্দ্র করে এবং বাফার মধ্যে ১৯৬৩ সালের দিকে আমরা একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলাম। উদ্যোগটির নাম ছিলো বাফা শিশু শিক্ষালয়। ললিতকলা চর্চার আবহাওয়ায় শিশু-কিশোররা এখানে তাদের সাধারণ পাঠ্যসূচির পাঠ গ্রহণ করতো। তাতে দেখা গেছে, শিশু-কিশোরদের পরীক্ষার ফল কোনোক্রমেই খারাপ হয় না। অত্যন্ত খুশির কথা, বর্তমানকালে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে ললিতকলাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, কিন্তু তখন এটা অনেকে ভাবতেও পারতেন না । আমাদের সে শিক্ষালয়ে প্রথম প্রিন্সিপাল ছিলেন জাহানারা ইমাম (পরবর্তীকালের শহীদ-জননী) এবং এ শিক্ষালয় উদ্বোধন করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস-চ্যান্সেলর ডক্টর মাহমুদ হোসেইন (তিনি ছিলেন ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডক্টর জাকির হোসেনের ছোটো ভাই)। পরবর্তীতে এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়
তথ্য সূত্র: আমার জীবনস্মৃতি, মাহমুদ নূরুল হুদা প্রকাশনা: বাংলা একাডেমি, জানুয়ারী ১৯৯৯/মাঘ ১৪০৫
2.png)